১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কায়দে আযম জিন্নাহ

 (সংগ্রহ) 

পু‌রোটা প‌ড়ে স্তব্ধ হ‌য়ে গেলাম। হৃদয়টা কান্নায় হাহাকার ক‌রে ওঠ‌লো। জিন্নাহ সাব সম্প‌র্কে একটা পু‌রো ধারণা পেলাম। থানবী র. এর স্বপ্ন স‌ত্যি হ‌লো। আল্লাহপাক কা‌য়ে‌দে আজম জিন্নাহ‌কে রহম করুন।


"১৮৭৬ সালের ২৫ ডিসেম্বর করাচিতে, একটি ব্যবসায়ী মুসলিম পরিবারে, তার জন্ম হয়। তাঁর বাবা জিন্নাহভাই পুনজা ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী। তুলা, উল, শস্যসহ বিভিন্ন পণ্য নিয়ে তাঁর ব্যবসা ছিল। পরিবারটি ছিল মুসলিম খোজা সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। তাঁর মা ছিলেন মিথিবাই। পরিবারটির আদি সম্পর্ক ছিল কাঠিয়াওয়ার অঞ্চলের সঙ্গে, পরে তারা করাচিতে এসে বসতি গড়ে। 


পরিবারে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা থাকলেও জিন্নাহ ছোটবেলা থেকেই নিজের মতো করে চলতে পছন্দ করতেন। তাঁর মধ্যে আত্মনির্ভরতার প্রবল প্রবণতা ছিল। তিনি শুধু পরিবারের ব্যবসা উত্তরাধিকারসূত্রে গ্রহণ করে বসে থাকতে চাননি; নিজের যোগ্যতায় নিজের ভবিষ্যৎ তৈরি করার আকাঙ্ক্ষা তাঁর মধ্যে খুব অল্প বয়সেই দেখা যায়। তাঁর পরিবার চেয়েছিল তিনি ব্যবসায় যুক্ত হন। কিন্তু জিন্নাহর মন ছিল অন্য জায়গায়। তাঁর যুক্তিবোধ, কথা বলার ক্ষমতা, মানুষের সামনে নিজের বক্তব্য তুলে ধরার দক্ষতা এবং কোনো বিষয় গভীরভাবে বোঝার আগ্রহ ছিলো তার।


তখন করাচি ছিল ব্রিটিশ ভারতের বোম্বে প্রেসিডেন্সির অন্তর্ভুক্ত।  তিনি ছিলেন স্বাধীনচেতা এবং নিয়মের মধ্যে থাকতে অনাগ্রহী ছিলেন। প্রথমে করাচির সিন্ধ মাদ্রাসাতুল ইসলাম স্কুলে পড়েন। পরে তাঁর এক ফুফু তাঁকে বোম্বেতে নিয়ে যান, কারণ তাঁর ধারণা ছিল বোম্বেতে পড়াশোনার সুযোগ ভালো হবে। সেখানে গোকুলদাস তেজ প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হন। কিন্তু সেখানেও খুব বেশি দিন থাকেননি; আবার করাচিতে ফিরে আসেন। এরপর সিন্ধ মাদ্রাসায় পড়েন এবং শেষ পর্যন্ত খ্রিস্টান মিশনারি সোসাইটি হাইস্কুলে ভর্তি হন। 


তাঁর ছাত্রজীবনে গণিত তাঁর ভালো লাগত না। অথচ তাঁর বাবা ছিলেন ব্যবসায়ী এবং মনে করতেন ব্যবসার জন্য গণিতে ভালো হতে হবে। জিন্নাহর ভবিষ্যৎ নিয়ে তখন তাঁর পরিবারেরও একটা দ্বিধা ছিল ছেলেকে ব্যবসায় নেওয়া হবে, নাকি অন্য কোনো পেশায়? পরবর্তীকালে বোঝা যায়, ব্যবসা জিন্নাহর জন্য নয় তাঁর আসল শক্তি ছিল যুক্তি, ভাষা, বিতর্ক এবং আইন। 


এই সময় তাঁর বাবার একজন ব্রিটিশ ব্যবসায়ি ফ্রেডেরিক লেই ক্রফট তরুণ জিন্নাহর মধ্যে সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছিলেন এবং লন্ডনে তাঁর প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ শেখার সুযোগ করে দিতে চেয়েছিলেন। তখন জিন্নাহর বয়স ছিল কিশোর বয়স। প্রস্তাবটি ছিল গ্রাহামস শিপিং অ্যান্ড ট্রেডিং কোম্পানির লন্ডন অফিসে এপারেন্টিচশিপ বা শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করা। জিন্নাহর বাবা সুযোগটি গ্রহণ করলেন। 


ছেলে বিদেশে চলে যাবে এটা সহজে মেনে নিতে পারেননি তার মা। তখনকার সামাজিক বাস্তবতায় এত অল্প বয়সে একজন ছেলেকে একা ইংল্যান্ডে পাঠানো ছিল বড় ব্যাপার। মা চেয়েছিলেন, ছেলে যেন কোনোভাবে পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখে এবং ফিরে আসে। তাই লন্ডনে যাওয়ার আগে তাঁর বিয়ে দেওয়া হয় এমিবাইয়ের সঙ্গে, যিনি কাঠিয়াওয়ারের প্যানেলি গ্রামের মেয়ে এবং তাঁর আত্মীয় ছিলেন। বিয়েটি হয়েছিল ১৮৯২ সালে, জিন্নাহ তখন কিশোর। 


তারপর তিনি ইংল্যান্ডে চলে যান। উদ্দেশ্য ছিল ব্যবসার কাজ শেখা, কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি নিজের প্রতিভার সঙ্গে মানানসই একটি ক্ষেত্র খুঁজে পান। তিনি আইন পড়ার সিদ্ধান্ত নেন। লন্ডনের লিংকনস ইনে আইন পড়েন এবং ১৮৯৬ সালে ব্যারিস্টার হন। 


লন্ডনে থেকেও তিনি নিজের শিকড়কে ভুলে যাননি। তিনি বুঝতে শুরু করেন যে শক্তিশালী সমাজ গড়তে হলে শিক্ষিত হতে হবে, আইনের জ্ঞান থাকতে হবে এবং রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। তাঁর পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনে এই চিন্তার গভীর প্রভাব দেখা যায়।

তাঁর ব্যক্তিগত জীবনও তখন খুব সহজ ছিল না। ইংল্যান্ডে থাকার সময় তাঁর মা এবং অল্পবয়সী স্ত্রী মারা যান। এত অল্প বয়সে পরপর এমন ব্যক্তিগত আঘাত পাওয়ার পরও তিনি ভেঙে পড়েননি। নিজের জীবনকে নতুনভাবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন। এখান থেকেই তাঁর ব্যক্তিত্বের একটি বড় বৈশিষ্ট্য দেখা যায় কঠিন পরিস্থিতিতে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা।


ব্যারিস্টার হয়ে তিনি ভারতে ফিরে আসেন। প্রথমে করাচিতে আইন পেশায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেন। খুব একটা সুবিধা করতে না পেরে বোম্বেতে চলে যান। সেখানে তাঁর হাতে কোনো বড় রাজনৈতিক ক্ষমতা ছিল না, কোনো বিশাল রাজনৈতিক পরিবারও তাঁকে এগিয়ে দেয়নি। একজন তরুণ আইনজীবী হিসেবে নিজের মেধা, যুক্তি ও পরিশ্রম দিয়ে ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান তৈরি করেন।


রাজনীতিতে প্রবেশ করার সময় তাঁর চিন্তা ছিল আরও বিস্তৃত। তিনি প্রথমদিকে ভারতীয়দের রাজনৈতিক অধিকার বৃদ্ধির পক্ষে ছিলেন এবং হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে রাজনৈতিক সহযোগিতা চান। তাঁর কাছে ধর্ম মানুষের পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও রাজনৈতিক অধিকার ও সাংবিধানিক ন্যায়ের প্রশ্নটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


তিনি মনে করতেন, কোনো বড় সংখ্যাগোষ্ঠীর হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা থাকলেই সংখ্যালঘুদের অধিকার নিরাপদ হয়ে যায় না; তাদের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সুরক্ষা দরকার। এই চিন্তা থেকেই তিনি মুসলমানদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও অধিকার নিয়ে ক্রমশ বেশি সক্রিয় হন।


কংগ্রেসের বিভিন্ন কর্মকান্ডে বিশেষ করে গান্ধির দনর্মীয় আবেগকে কাজে লাগানোয় জিন্নার মনে আশংকা তৈরি হয়। তার প্রধান আশঙ্কা ছিল, ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে যাওয়ার পর যদি একটি একক গণতান্ত্রিক ভারত তৈরি হয়, তাহলে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক আধিপত্যের মধ্যে মুসলমানরা স্থায়ীভাবে সংখ্যালঘু হয়ে পড়তে পারে।

তাঁর যুক্তিটি মোটামুটি এমন ছিল গণতন্ত্রে “এক ব্যক্তি এক ভোট” হলে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী সরকার গঠন করবে। ভারতজুড়ে হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, মুসলমানরা সর্বভারতীয়ভাবে সংখ্যালঘু। তাই শুধু সাংবিধানিক অধিকার দিয়ে মুসলমানদের রাজনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে।


জিন্নার আশঙ্কার কয়েকটি দিক ছিল

রাজনৈতিক ক্ষমতা হারানোর আশঙ্কা

কেন্দ্রীয় সরকারে মুসলমানরা সংখ্যায় কম হওয়ায় তাদের রাজনৈতিক প্রভাব ক্রমে কমে যেতে পারে।

“Majority rule” বা সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন নিয়ে ভয়

জিন্না মনে করতেন, ভারতীয় বাস্তবতায় ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং রাজনৈতিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অনেকটা একই হয়ে যাবে।


মুসলমানদের নিজস্ব ধর্মীয় আইন, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও সামাজিক রীতিনীতি ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রে যথেষ্ট সুরক্ষা পাবে কি না এ নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন। কংগ্রেসের ওপর আস্থার সংকট

বিশেষ করে ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের পর কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক সরকারগুলোর কিছু নীতি ও আচরণ মুসলিম লীগের কাছে এই ধারণা জোরদার করে যে কংগ্রেসের “জাতীয়তাবাদ” বাস্তবে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতার রাজনৈতিক আধিপত্যে পরিণত হতে পারে।


এখানে তাঁর চিন্তা ছিল “যদি মুসলমানদের অধিকার সাংবিধানিকভাবে নিশ্চিত করা যায়, তাহলে আলাদা রাষ্ট্রের দরকার নেই।” অর্থাৎ তখনও তিনি মূলত একটি ভারতীয় রাষ্ট্রের ভেতরে মুসলিম নিরাপত্তার ব্যবস্থা খুঁজছিলেন।


জিন্না প্রথমদিকে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রবল সমর্থক ছিলেন। তিনি কংগ্রেসের সঙ্গে কাজ করেছেন এবং একসময় তাঁকে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রবক্তা বলা হতো। এমনকি ১৯১৬ সালের Lucknow Pact-এ কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ একসঙ্গে সাংবিধানিক দাবিতে সমঝোতা করেছিল।


কিন্তু পরবর্তীতে তাঁর অবস্থান বদলাতে থাকে। 

জিন্না প্রথমে আলাদা রাষ্ট্রের বিরোধী ছিলেন; তিনি চেয়েছিলেন একই ভারতের মধ্যে মুসলমানদের রাজনৈতিক নিরাপত্তা। কিন্তু সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো ব্যবস্থা কংগ্রেস মেনে নিচ্ছিলো না।


১৯২০-এর দশকে গান্ধী ভারতীয় রাজনীতিতে গণআন্দোলন, অসহযোগ ও ধর্মীয় আবেগকে রাজনৈতিক সংগঠনের অংশ হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করলে সেটাকে মুসলিমদের জন্য বিপদজনক হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করতেন। জিন্না তুলনামূলকভাবে ছিলেন আইন, সংসদ ও সাংবিধানিক আলোচনার রাজনীতির মানুষ। তিনি মনে করতেন, ধর্মীয় মানুষের জন্য চিন্তা ভিন্ন, কিন্তু ধর্মীয় আবেগকে রাজনীতির সঙ্গে বেশি মেশানো বিপজ্জনক হতে পারে। এখানে তাঁর সঙ্গে কংগ্রেস নেতৃত্বের দূরত্ব বাড়ে।


১৯২৮ সালের Nehru Report ছিল বড় মোড়

এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিটিশদের কাছ থেকে সাংবিধানিক সংস্কারের দাবিতে ভারতীয় নেতারা একটি সংবিধানের খসড়া তৈরি করেন যেটা Nehru Report নামে পরিচিত।

জিন্না চেয়েছিলেন মুসলমানদের জন্য আরও শক্তিশালী সাংবিধানিক সুরক্ষা। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় আইনসভায় মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব এবং প্রদেশগুলোর ক্ষমতা নিয়ে তাঁর দাবি ছিল।


তিনি কিছু সংশোধনী প্রস্তাব দেন, যেগুলো পরে “Jinnah's Fourteen Points” নামে পরিচিত হয়।

সেখানে ছিলঃ


১. ভারত হবে একটি ফেডারেল রাষ্ট্র, এবং অবশিষ্ট ক্ষমতা প্রদেশের হাতে থাকবে।


২. সব প্রদেশকে সমান স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে।


৩. সকল প্রদেশের আইনসভায় সংখ্যালঘুদের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।


৪. কেন্দ্রীয় আইনসভায় মুসলমানদের কমপক্ষে এক-তৃতীয়াংশ প্রতিনিধিত্ব থাকতে হবে।


৫. পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী বা সেপারেট ইলেক্ট্রোরেটস  বজায় রাখতে হবে।


৬. কোনো প্রদেশের সীমানা এমনভাবে পরিবর্তন করা যাবে না যাতে কোনো সম্প্রদায়ের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নষ্ট হয়।


৭. সকল সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।


৮. কোনো সম্প্রদায়ের তিন-চতুর্থাংশ সদস্যের বিরোধিতা থাকলে কোনো আইন পাস করা যাবে না।


৯. সিন্ধুকে বোম্বে প্রেসিডেন্সি থেকে পৃথক করতে হবে।


১০. NWFP ও বেলুচিস্তানে অন্যান্য প্রদেশের মতো সাংবিধানিক সংস্কার করতে হবে।


১১. মুসলমানদের সরকারি চাকরিতে যথাযথ অংশ নিশ্চিত করতে হবে।


১২. মুসলমানদের সংস্কৃতি, শিক্ষা, ভাষা, ধর্মীয় আইন ও ব্যক্তিগত আইন সুরক্ষিত করতে হবে।


১৩. কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক মন্ত্রিসভায় মুসলমানদের কমপক্ষে এক-তৃতীয়াংশ প্রতিনিধিত্ব থাকতে হবে।


১৪. প্রদেশগুলোর সম্মতি ছাড়া ফেডারেল সংবিধানে পরিবর্তন করা যাবে না।


এগুলো মেনে না নেওয়ায়

১৯৩০-এর দশকে তিনি আরও হতাশ হন

এক পর্যায়ে জিন্না লন্ডনে চলে যান এবং কিছুটা ভারতীয় রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে চেয়েছিলেন। সেখানে তিনি হয়তো ভালো থাকতে পারবেন কিন্তু এই অঞ্চলের মুসলিমদের কি হবে? এই অবস্থায় সেখানে তিনি Round Table Conference এ ভারতের সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন। কিন্তু সম্মেলনগুলো থেকেও তিনি কাঙ্ক্ষিত সমাধান পাননি।

 

১৯৩৪ সালের দিকে মুসলিম লীগের কিছু নেতা, বিশেষ করে লিয়াকত আলী খান, তাঁকে আবার ভারতে ফিরে এসে মুসলিম লীগের নেতৃত্ব নিতে উৎসাহিত করেন।

 

জিন্না শেষ পর্যন্ত ফিরে আসেন এবং তখন থেকেই মুসলিম লীগকে নতুনভাবে সংগঠিত করতে শুরু করেন। এরপর ১৯৩৭ সালের নির্বাচন এবং তার পরের ঘটনাগুলো তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও কঠোর করে তোলে।

এর মধ্যে ভারতের রাজনীতিতে একটা গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে, কংগ্রেস ক্রমশ সর্বভারতীয় রাজনৈতিক শক্তি হয়ে উঠছিল। জিন্নার কাছে প্রশ্নটা তখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। স্বাধীন ভারত হলে কেন্দ্রের ক্ষমতা কার হাতে থাকবে?

যদি কেন্দ্রে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সরকার হয়, তাহলে মুসলমানরা সর্বভারতীয় পর্যায়ে সংখ্যালঘু থাকবে।


১৯৩৫ সালের Government of India Act-এর অধীনে ১৯৩৭ সালে প্রাদেশিক নির্বাচন হয়। কংগ্রেস অধিকাংশ  প্রদেশে সরকার গঠন করে। এই নির্বাচন জিন্নার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ মোড় ছিল। নির্বাচনের আগে জিন্না আশা করেছিলেন, মুসলিম লীগ মুসলমানদের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে এবং কংগ্রেসের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগি করে চলা সম্ভব হবে। কিন্তু ফলাফলে দেখা গেল, মুসলিম লীগ মুসলিম-অধ্যুষিত অনেক প্রদেশেই এককভাবে শক্তিশালী নয়। পাঞ্জাব ও বাংলার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশে আঞ্চলিক মুসলিম দলগুলোও যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল।

 

অন্যদিকে কংগ্রেস অনেক প্রদেশে ভালো ফল করে সরকার গঠন করে। জিন্নার কাছে এতে একটি নতুন সমস্যা স্পষ্ট হয় স্বাধীনতার পর যদি কংগ্রেসই সর্বভারতীয় ক্ষমতার প্রধান দাবিদার হয়, তাহলে মুসলিম লীগের হাতে মুসলমানদের রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য কতটা ক্ষমতা থাকবে?

 

১৯৩৭ থেকে ৩৯ সালের কংগ্রেস সরকারগুলোর কিছু নীতি নিয়ে মুসলিম লীগের অভিযোগও জিন্নার অবস্থান শক্ত করে। যেমন শিক্ষা, ভাষা, **বন্দে মাতরম**, কংগ্রেসের পতাকা ও প্রশাসনে কংগ্রেসের প্রভাব নিয়ে মুসলিম লীগের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়। এসব অভিযোগের কিছু ছিল বাস্তব রাজনৈতিক বিরোধের বিষয়, এ সময় জিন্নার চিন্তায় একটা বড় পরিবর্তন দেখা যায়।

 

ফলে তিনি বলেন  **“কংগ্রেস যদি মুসলমানদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় ও ক্ষমতার দাবি মেনে না নেয়, তাহলে একক ভারতীয় রাষ্ট্রে মুসলমানদের নিরাপত্তা থাকবে না।”**

 

এর ফলে তিনি মুসলিম লীগকে শুধু একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে না রেখে **ভারতের মুসলমানদের একমাত্র রাজনৈতিক প্রতিনিধি** হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন।

 

১৯৩৭ সালের পর জিন্না তাই মুসলমানদের মধ্যে ব্যাপক রাজনৈতিক সংগঠন শুরু করেন। মুসলিম লীগের সদস্যসংখ্যা ও প্রভাব দ্রুত বাড়তে থাকে।

 

অর্থাৎ ১৯৩৭ সালের নির্বাচন জিন্নাকে একটা শিক্ষা দিয়েছিল বলে বলা যায় **শুধু সাংবিধানিক সংখ্যালঘু অধিকার চেয়ে মুসলমানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন; মুসলমানদের একটি আলাদা রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে সংগঠিত করতে হবে।** সেই রাজনৈতিক ধারণাই ধীরে ধীরে পাকিস্তানের দাবিতে পরিণত হয়।


জিন্না ও মুসলিম লীগের অভিযোগ ছিল কিছু কংগ্রেস সরকার এমন কিছু নীতি গ্রহণ করেছে যা মুসলমানদের কাছে “হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়ার” আশঙ্কা তৈরি করেছিল। এর মধ্যে কংগ্রেসের প্রতীক, শিক্ষা ও ভাষানীতি, বন্দে মাতরম নিয়ে বিতর্ক ইত্যাদি বিষয় মুসলিম লীগের প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।


এরপর জিন্নার যুক্তি বদলে যায় এখানেই তাঁর চিন্তার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। আগে “মুসলমানদের অধিকার রক্ষা করে ভারতকে ঐক্যবদ্ধ রাখা সম্ভব।”

পরে “কংগ্রেস যদি মুসলমানদের জন্য পর্যাপ্ত সাংবিধানিক সুরক্ষা দিতে না চায়, তাহলে ঐক্যবদ্ধ ভারতই মুসলমানদের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।”


এই পরিবর্তনটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থাৎ তাঁর কাছে আলাদা রাষ্ট্র প্রথম পছন্দ ছিল এমনটা বলা কঠিন। বরং রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা যত কমেছে, আলাদা রাষ্ট্রের দাবি তত শক্তিশালী হয়েছে।


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও বদলে দেয়

১৯৩৯ সালে ব্রিটেন ভারতের সঙ্গে আলোচনা না করেই ভারতকে যুদ্ধে যুক্ত করে। কংগ্রেস এর প্রতিবাদ করে এবং কংগ্রেসের প্রাদেশিক মন্ত্রিসভাগুলো পদত্যাগ করে।


১৯৪০ সালে শেষ পর্যন্ত মুসলিম লীগ লাহোর প্রস্তাব গ্রহণ করে। লাহোর প্রস্তাবের সময় তাঁর রাজনৈতিক নেতৃত্ব নতুন পর্যায়ে পৌঁছে যায়। মুসলমানদের জন্য আলাদা রাজনৈতিক ভবিষ্যতের দাবিতে এটি একটি বৃহৎ রাজনৈতিক আন্দোলনে পরিণত হয়। জিন্নাহ সেই আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতা হয়ে ওঠেন। এখানে মুসলিম-অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোর জন্য স্বাধীন রাজনৈতিক রাষ্ট্র রাষ্ট্রসমূহের কথা বলা হয়।

এটাই পাকিস্তান আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মাইলফলক।


এরপর জিন্নার অবস্থান আর শুধু “সংখ্যালঘু অধিকার”-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তিনি মুসলমানদেরকে একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক জাতি হিসেবে উপস্থাপন করতে শুরু করেন।


এর মধ্যেই জিন্না অসুস্থ হয়ে পড়েন, তার অসুস্থতার খবর তিনি গোপন করে গেছেন। ১৯৪৬–৪৭ তখন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে জিন্না ও মুসলিম লীগের সঙ্গে কংগ্রেসের তীব্র বিরোধ চলছে। একই সময়ে জিন্না গুরুতর যক্ষ্মায় আক্রান্ত ছিলেন এবং তিনি জানতেন যে তাঁর হাতে হয়তো খুব বেশি সময় নেই।


এই তথ্যটা তিনি প্রকাশ্যে আসতে দেননি। তাঁর চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত অল্প কয়েকজন মানুষ বিষয়টি জানতেন। কারণ জিন্নার কাছে তাঁর ব্যক্তিগত অসুস্থতার খবরটা শুধু ব্যক্তিগত ব্যাপার ছিল না এটা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারত।


ধরুন, ব্রিটিশ সরকার যদি নিশ্চিতভাবে জানতে পারত যে জিন্না মারাত্মক অসুস্থ এবং হয়তো এক-দুই বছরের বেশি বাঁচবেন না, তাহলে তারা ভাবতে পারত জিন্না না থাকলে মুসলিম লীগের নেতৃত্ব কী হবে? পাকিস্তানের দাবিটা কি তখনও একই শক্তিতে থাকবে? কংগ্রেসও হয়তো জিন্নার সঙ্গে দর-কষাকষির পরিবর্তে সময় নেওয়ার কৌশল নিতে পারত।


জিন্না নিজেও বুঝতেন, পাকিস্তানের দাবির সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক মুখ তিনি নিজেই। তাঁর ব্যক্তিগত নেতৃত্ব মুসলিম লীগকে একত্রে ধরে রেখেছিল। তাই তাঁর মৃত্যুর সম্ভাবনা প্রকাশ পেলে তাঁর দর-কষাকষির ক্ষমতা কমে যেতে পারত। এই কারণেই তিনি অসুস্থতাকে গোপন রাখেন বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় সাধারণত ব্যাখ্যা করা হয়।


জিন্নার অসুস্থতার খবর যদি আগে প্রকাশ পেত, তাহলে ব্রিটিশরা কি স্বাধীনতা ও ভারত ভাগের প্রক্রিয়া অন্যভাবে চালাত? পরবর্তীকালে Mountbatten-এর নামে এমন একটি দাবি প্রচলিত হয়েছে যে তিনি যদি জিন্নার অসুস্থতার কথা আগে জানতেন, তাহলে হয়তো পরিস্থিতি অন্যরকম হতে পারত।


১৯৪৬ সালের নির্বাচন, মুসলিম লীগের জনপ্রিয়তা, কংগ্রেস ও লীগের সম্পর্কের ভাঙন, ব্রিটিশদের দ্রুত ভারত ছাড়ার সিদ্ধান্ত, সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ সবকিছু মিলেই পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছিল। তাই জিন্না অসুস্থতা গোপন করেছিলেন এটা বেশ শক্তিশালীভাবে সমর্থিত ইতিহাস। 

নিজের অসুস্থতার কথা জানতেন, কিন্তু তারপরও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়। তার মাত্র প্রায় ১৩ মাস পরে, ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জিন্না মারা যান।


এভাবেই মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় একটি মুসলিম রাষ্ট্র তৈরি হয়, সেই সময় যেখানে গরুর গোস্ত খাওয়ার অপরাধে পিটিয়ে মারা হবে কিনা সেই চিন্তা যদিও ছিলো না, মসজিদে মসজিদের তলায় অন্য ধর্মের অস্তিত্ব খুজে পাওয়ার বিষয়ও সে সময় যদিও ছিলো না কিন্তু একটা আশংকা ঠিকি ছিলো। যা কয়েক দশক পরে হলেও বাস্তবে রুপ নিয়েছে।


১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জিন্না মারা গেলেও তার প্রায় ২০ বছর পরে মুসলিমদের জন্য আলাদা রষ্ট্র গঠনের কারণে তাকে বাংলাদেশীরা ও ভারতীয়রা প্রচন্ডভাবে অপছন্দ করেন। তার মৃত্যুর ২০ বছর পরে ৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর অপকর্মের দায়ও তার উপরই চাপানো হয়। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় অভিযোগটি হলো ভাষা নিয়ে। তিনি উর্দুকে পাকিস্তানি ভাষা করতে চেয়েছিলেন যদিও উর্দুতে ততকালীন পাকিস্তানের খুব অল্প সংখ্যক মানুষই কথা বলতো। 


পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সময় পূর্ব বাংলায় মানুষের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠের মাতৃভাষা ছিল বাংলা। পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার মধ্যেও বাঙালিরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল। কিন্তু পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের একটি বড় অংশ উর্দুকে মুসলিম জাতীয়তার প্রতীক হিসেবে দেখছিল।


১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রস্তাব দেন যে বাংলাকেও গণপরিষদের ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক। তাঁর যুক্তি ছিল পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বাংলাভাষী, তাই বাংলাকে বাদ দেওয়া যুক্তিসঙ্গত নয়। কিন্তু প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যাত হয়।


এরপর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়। জিন্না মার্চে ঢাকায় আসেন। ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বিশাল জনসমাবেশে তিনি ভাষার প্রশ্নে তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করেন। তিনি বলেন, পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক ভাষা কী হবে সেটা পূর্ব বাংলার মানুষ নিজেরাই ঠিক করবে। অর্থাৎ তিনি বাংলা ভাষাকে পূর্ব বাংলার প্রশাসনিক বা প্রাদেশিক ভাষা হওয়ার অধিকার পুরোপুরি অস্বীকার করেননি। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি বলেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু, অন্য কোনো ভাষা নয়। তাঁর যুক্তি ছিল, একটি রাষ্ট্রকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে একটি অভিন্ন রাষ্ট্রভাষা দরকার। 


এরপর ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে সমাবর্তন বক্তৃতায় তিনি একই কথা আরও পরিষ্কার করে বলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল পূর্ব বাংলার মানুষ চাইলে বাংলা প্রাদেশিক ভাষা হিসেবে গ্রহণ করতে পারে, কিন্তু পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশের মধ্যে যোগাযোগের ভাষা এবং রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত উর্দু। তিনি উর্দুকে মুসলিম সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে বেশি ঘনিষ্ঠ বলেও ব্যাখ্যা করেন


এখানেই বাঙালি ছাত্রদের সঙ্গে জিন্নার মতপার্থক্য প্রকাশ্যে চলে আসে। তাঁর বক্তৃতার সময়ই হলের ভেতর থেকে “No, no” বলে প্রতিবাদ হয়। এখানেই অনেকেই আশ্চর্জ হয়ে যান No, No ইংরেজি শব্দ শুনে। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে জিন্নাকে যে মানুষগুলো কয়েক মাস আগেও অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখেছিল, তাদের একটি অংশ ভাষার প্রশ্নে তাঁর বিরোধিতা শুরু করে। 


জিন্নার অবস্থানটা বুঝতে হলে তাঁর চিন্তার আরেকটি দিক দেখতে হবে। তিনি মনে করতেন পাকিস্তান মূলত মুসলমানদের রাজনৈতিক ঐক্যের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে। তাঁর চোখে উর্দু ছিল সেই সর্বভারতীয় মুসলিম রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি প্রতীক। তাই তিনি ভাবছিলেন বাংলা, পাঞ্জাবি, সিন্ধি, পশতু ইত্যাদি আলাদা আলাদা প্রাদেশিক ভাষা থাকলে পাকিস্তানের বিভিন্ন অংশের মধ্যে বিভাজন তৈরি হতে পারে একটি সাধারণ ভাষা রাষ্ট্রকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে সাহায্য করবে। তাঁর ২৪ মার্চের বক্তব্যে এই যুক্তিটাই স্পষ্ট করে। সোর্চ Songramer Notebook


কিন্তু এখানেই তাঁর যুক্তির বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার মানুষ জিন্নার কাছে বলছিল, “আমরা মুসলমান, কিন্তু আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। মুসলমান হওয়ার কারণে কেন আমাদের নিজের ভাষাকে রাষ্ট্রের সমান মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করা হবে?”

আর জিন্নার যুক্তি অনেকটা ছিল, “তোমরা বাংলা ব্যবহার করবে, কিন্তু পাকিস্তানের রাষ্ট্রের জন্য একটি অভিন্ন ভাষা দরকার, আর সেই ভাষা হবে উর্দু।”


বাঙালিরা এটাকে শুধু ভাষার সমস্যা হিসেবে দেখেনি। তারা বুঝতে শুরু করেছিল যে, যদি রাষ্ট্রের ভাষা উর্দু হয় অথচ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভাষা বাংলা হয়, তাহলে সরকারি চাকরি, প্রশাসন, শিক্ষা, সেনাবাহিনী, কেন্দ্রীয় রাজনীতি সব ক্ষেত্রেই পশ্চিম পাকিস্তানের উর্দুভাষী বা উর্দুকেন্দ্রিক জনগোষ্ঠী তুলনামূলক সুবিধা পেতে পারে।


জিন্না ১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বরে মারা যান। পরেও পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার চেষ্টা চালিয়ে যায়, ফলে বিরোধ আরও তীব্র হয় এবং শেষ পর্যন্ত জিন্নার মৃত্যুর প্রায় ৩ বছর পর ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির রক্তাক্ত আন্দোলনে পৌঁছায়। পরে ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলা ও উর্দু দুটিকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করা হয়। জিন্নার সাথে বাঙ্গালীর বিরোধ শুধু ভাষা কেন্দ্রিক, যদিও অন্য কোনো ভাষাভাষির মানুষেরা ভাষা নিয়ে আন্দোলন করেনি এজন্যই বাঙ্গালীরা বাংলা ভাষাকে নিয়ে গর্ব করে। যদিও সেই সময় চাকরি, প্রশাসন, শিক্ষা, সেনাবাহিনী, কেন্দ্রীয় রাজনীতি সব ক্ষেত্রেই পশ্চিম পাকিস্তানের উর্দুভাষী বা উর্দুকেন্দ্রিক জনগোষ্ঠী তুলনামূলক সুবিধা পেতে পারে এমন আশংকা থেকেই সেই রক্তক্ষয়ী আন্দোলন হয় এবং জিন্না ও পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে বিরোধ তৈরি হয় কিন্তু তা সত্যেও ইংরেজি না জানার কারণে বাঙ্গালী চাকরি পায় না।


জিন্নার জীবনে ব্যক্তিগত দুঃখ ছিল, রাজনৈতিক পরাজয় ছিল, একাকীত্ব ছিল, বিরোধিতা ছিল কিন্তু তাঁর আত্মবিশ্বাস ও কাজের প্রতি নিষ্ঠা তাঁকে এগিয়ে নিয়ে যায়। তিনি বিশ্বাস করতেন যে মানুষকে আবেগের চেয়ে চরিত্র, জ্ঞান, শৃঙ্খলা ও নীতির ওপর দাঁড়াতে হবে। এই জায়গা থেকেই জিন্নাহকে ইতিবাচকভাবে দেখলে তাঁর সবচেয়ে বড় গুণগুলো দাঁড়ায় আত্মনির্ভরতা, মেধা, শৃঙ্খলা, যুক্তিবাদিতা, সাংবিধানিক চিন্তা, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, নেতৃত্বের ক্ষমতা, ব্যক্তিগত সততা, আত্মমর্যাদা এবং কঠিন পরিস্থিতিতে অটল থাকার মানসিক শক্তি।


আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জিন্নাহকে বুঝতে হলে তাঁকে শুধু ১৯৪৭ সালের মানুষ বা বাংলা-উর্দু রাষ্ট্রভাষা  হিসেবে দেখলে হবে না। করাচির সেই ব্যবসায়ী পরিবারের কিশোর থেকে লন্ডনের তরুণ ব্যারিস্টার, সেখান থেকে বোম্বের সফল আইনজীবী, তারপর ভারতীয় রাজনীতির নেতা এবং শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা এই দীর্ঘ যাত্রাটাই তাঁর এই চরিত্রকে তৈরি করেছে।"


-Jahangir alam

কোন মন্তব্য নেই:

বৈশিষ্ট্যযুক্ত পোস্ট

কায়দে আযম জিন্নাহ

 (সংগ্রহ)  পু‌রোটা প‌ড়ে স্তব্ধ হ‌য়ে গেলাম। হৃদয়টা কান্নায় হাহাকার ক‌রে ওঠ‌লো। জিন্নাহ সাব সম্প‌র্কে একটা পু‌রো ধারণা পেলাম। থানবী র. এর স...

জনপ্রিয় লেখা সমূহ